গর্ভধারিণী - Gorvodharini সমরেশ মজুমদার।। বইয়ের রিভিউ

“একজন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে তার জন্য কোনো কিছুই আটকে থাকেনা। কেউ কিশোর বয়সে পুলিশের গুলিতে মারা যায় কেউ সত্তরে রোগে মারা পড়ে। যতদিন প্রাণ ততদিন সব চোখের সামনে, যেই শরীরটা গেল অমনি অস্তিত্ব শেষ। আবার কারোও কারোও স্মৃতি কিছু বছর, কয়েক বছর অথবা শতাব্দী মনে রাখে মানুষ। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষকে তিনমাসেই বিস্মরিত হয় মানুষ, যারা থেকে গেলো। হেসে ফেলল সুদীপ। কেউ থাকেনা। যাওয়ার জন্যে অপ্রস্তুত থাকে। মা এখন কোথায়? একটাই তো জীবন আর সময়টাও বড় অল্প অথচ মানুষ ভাবার সময় কয়েক শতাব্দী ধরে নিজেকে ছড়িয়ে ভাবে। কল্যাণ তবু যাওয়ার আগে কিছু ওষুধ পৌঁছে দিয়ে গেল। তার পরে যে মানুষগুলো যাবেই তাদের থাকার সময়টা যাতে একটু স্বস্তিতে কাটে তারই ব্যবস্থা করে গেলো। এইটুকুই বা ক’জন করতে পারে। সাবাস কল্যাণ!” — গর্ভধারিণী।

বইঃ গর্ভধারিণী

কাহিনী সংক্ষেপঃ 

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং তথাকথিত সামাজিক চেহারার পরিবর্তন মানুষ কামনা করলেও তাতে অংশ নেন না তারা সক্রিয়ভাবে।সকল বাঁধা নিয়ম ভেঙে সংগ্রামের পথে নেমে আসে কলকাতার বুকে বেড়ে ওঠা চার জন বন্ধু। আনন্দ, সুদীপ, কল্যাণ ও একজন নেয়ে সংগ্রামী মুখ জয়িতা।চোখের সামনে ভেসে বেড়ানো কতগুলো অনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় তারা।প্রথমে ধ্বংস করে প্যারাডাইস চক্রটি,তারপর একে একে জাল ঔষধের ব্যাবসা এবং অসৎ মন্ত্রীকে ধ্বংস করে তাদের সূচনার পথ শুরু করতে সক্ষম হয়।অতঃপর গা ঢাকা দিতে তারা চলে যায় সান্দাকফু পেড়িয়ে তাপল্যাভ নামক এক পাহাড়ী গ্রামে, সেখানে তারা তাদের আশ্রয় খুঁজে নিতে সক্ষম হয়,কলকাতা শহর থেকে বেড়িয়ে এসে তারা পাহাড়ী অজানা গ্রামের মানুষদের ভালোবাসা,বিশ্বাস অর্জন করে নেয়।সেখানে গ্রামকে সভ্যতায় ঠাঁই দেওয়ার নতুন পরিকল্পনা করে। বিভিন্ন বিপদ অতিক্রম, অজানা সব কর্মের সম্মুখীন হয়,সাহসের সাথে সকল বাধাঁ কাটিয়ে তারা জায়গা করে নেয় সেখানে।তারই মধ্যে তাপল্যাভ থেকে ফালুট, সান্দাকফু, বিকেভন্জ্ঞন হয়ে দার্জিলিং ফিরে আসার পথে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় কল্যাণ।গ্রামটির উন্নতিতে শুরু হয় বাকি তিনজনের লড়াই সাথে গ্রামবাসীদের মিলন। এভাবেই তারা পরিশ্রম, ভালোবাসার সাথে এক হয়ে কাজ করে সক্ষম হয় দারিদ্র্যের বেড়াজাল দূর করতে পাহাড়ী গ্রামের। শুরু হলো তাদের দলের নারী জয়িতার অসামান্য চিন্তাশক্তির জাগরণ, তার আত্মত্যাগে ও সাধনায় পাহাড়ী গ্রামগুলো চাঞ্চল্য হয়ে ওঠে।পাহাড়ী গ্রামের এক যুবক রোলেনের উত্তরাধিকার বেড়ে ওঠে জয়িতার গর্ভে। পাহাড়ের  সমুজ্জ্বল হয় গর্ভধারিণী জয়িতা/দ্রিমিত।

আরো পড়ুনঃ অপরাজিত উপন্যাস রিভিউ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়


পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ

বইটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এক অদৃশ্য আকর্ষণ কাজ করে। লেখক পুরো বইয়ে সমাজের এলিট শ্রেণির পারিবারিক বিপর্যয় তুলে ধরেছেন। সেই সাথে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ভালোবাসা,আত্বিক বন্ধন, শিক্ষার স্ফুটন ঘটে আনন্দ চরিত্রটির মাধ্যমে। এই চরিত্র পুরো বইয়ে কিছুটা কর্তার ভূমিকা পালন করে। সামাজিক অবক্ষয় যে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে আর সেই অবক্ষয়ের জন্য যে বাঙালী সমাজের গা বাঁচিয়ে চলাটাই দায়ী- উপন্যাস টিতে তা চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি লেখকের সমাজচিন্তা, নারীদের সামাজিক অবস্থান আর নারী স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি লেখক তুলে ধরেছেন। সমরেশের বেশ কিছু বইয়ে নারীদের স্বাধীনতার বিষয় টি উঠে এসেছে। গর্ভধারিনী বইটিতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রতিটা চরিত্রই স্বতন্ত্র। একটি অন্যটি থেকে আলাদা। সামাজিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবু লেখকের পক্ষে তাদের মানসিক দ্বন্দ ও চিন্তা ভাবনা ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব হয়নি। অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ভাবে তিনি একই সাথে কলকাতা আর তাপল্যাঙ এর মানুষদের কথা তুলে ধরেছেন। লেখকের লেখনি এক্ষেত্রে অসাধারণ।


বইঃ গর্ভধারিণী
লেখকঃ সমরেশ মজুমদার
প্রকাশনি: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স 
মূল্য: ৯৭২ টাকা
রিভিউ লিখেছেন: তাসফিয়া নাজনীন ঐশি

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ