শেষের কবিতা- Shesher kobita বইয়ের রিভিউ।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার অমিত রায় ও লাবণ্যের পরিচয় হয় শিলিং পাহাড়ের পথে বিপরীতমুখী দুটি গাড়ির পরস্পর আকস্মিক দুর্ঘটনায়।

স্তব্ধ ও নির্জন পাহাড়ের সবুজ ঘেরা অরন্য দূর্লভ অবসরে দুজন দুজনকে দেখে মুগ্ধ হয়। কে জানতো? যার পরিনিতি শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াবে ভালোবাসায়?!!

বই: শেষের কবিতা


কাহিনি সংক্ষেপ: 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ব্যারিস্টার  অমিত রায় নিজেকে পাঁচজনের একজন না বলে পঞ্চমজন ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।  -ধারণায় আধুনিক হলেও তার সবকিছুতে মৌলিকত্বের ছাপ বিদ্যমান।  তার জীবনে নারীর অভাব নেই। তার জন্য কন্যাদায়গ্রস্ত মায়েদের অপরিসীম আগ্রহ থাকলেও কন্যারা ঠিকই জানে যে অমিত ধরাছোঁয়ার বাইরের এক সত্তা - যার রূপমাধুরী দূর থেকে অবলোকন করা যায় ; কিন্তু কাছে গিয়ে স্পর্শ করা যায় না। অমিত গতানুগতিক ফ্যাশানে বিশ্বাসী না,বরং তার পছন্দ স্টাইল।  অমিতের ভাষ্য,"ফ্যাশানটা হলো মুখোশ, স্টাইলটা হলো মুখশ্রী।"

শিলঙয়ে বেরাতে গিয়ে ছোটখাটো এক দুর্ঘটনার মাধ্যমে দেখা হয় অমিত আর লাবণ্যের।  লাবণ্যের পুরো নাম লাবণ্য দত্ত। পশ্চিমি কলেজের অধ্যক্ষ অবনীশ দত্তের কন্যা সে। অবনীশ দত্ত তার প্রিয় কন্যাটাকে সর্বোচ্চ জ্ঞানদানের চেষ্টা করেছেন। পিতার ইচ্ছে লাবণ্য যদি জীবনে দাম্পত্য সম্পর্কে না-ও জড়ায় তবু নিজের পাণ্ডিত্যই তার সার্বক্ষণিক সহচর হবে।

প্রথম সাক্ষাতেই লাবণ্যের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে অমিত। অমিতের দৃষ্টিতে লাবণ্য সাধারণের মধ্যেই অসাধারণ। লাবণ্যের সম্পর্কে অমিতের ধারণা হলো এই যে, ড্রয়িংরুমে এই মেয়ে অন্য পাঁচজনের মাঝখানে পরিপূর্ণ আত্মস্বরূপে দেখা দিত না।

লাবণ্যকে পাবার জন্য অমিতের চেষ্টার ত্রুটি রইলো না। শহুরে অমিত বসতি গাড়লো প্রত্যন্ত শিলঙয়ে।  কিন্তু লাবণ্যের মন অনেক বেশিই হিসেবী।  অমিতের ঘরছাড়া স্বভাব তার কাছে অবিদিত নয়।  সে জানে অমিতকে বেশিদিন আঁচলে বেঁধে রাখা যায় না। যে গুণ অমিতকে তার কাছে টেনেছে সেই গুণের দর বেশিদিন রইবে না অমিতের কাছে।  এসব কারণে খুব ভালোবাসা সত্ত্বেও অমিতের আহ্বানে সে তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে পারেনি।


পরিণতিঃ 

শেষের কবিতায়”এই রকম পরিণতি অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত অন্তত আমার জন্য। ব্যক্তি লাবণ্যের প্রতি যে অমিতের ভালোবাসার বিন্দুবিসর্গ ছিলো না তা পাঠকরাও নিশ্চিত ভাবে বুঝে যায়।তবে অমিত “কেটি আমার ঘটির জল আর লাবন্য দীঘির জল।ঘটির জল পান করা যায় কিন্তু সাঁতার কাটা যায় না। দীঘির জলে সাঁতার কাটা যায় কিন্তু ঘরে তোলা তোলা যায় না “ এই বক্তব্যের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ সমর্থন করার চেষ্টা করেছেন।

শেষের কবিতা”য় যে উপাদান গুলো বা বিষয়গুলো  উপস্থাপন করেছেন  রবীন্দ্রনাথ, সে গুলো ১৯২৯ সালের প্রেক্ষাপটে কারো কল্পনা তেও ছিল না। একদম বিরল ছিল।এবং এসবের পুরো কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের

উপন্যাসের চরিত্রায়নে লেখক  সজাগ দৃষ্টি দিয়েছেন। কেতকীকে লেখক আপাতদৃষ্টিতে বেখাপ্পা টাইপের একটা চরিত্র হিসেবে পাঠকের কাছে পরিচয় করিয়ে দিলেও পরক্ষণে তার অতীতের আটপৌরে রূপটিও কারো অজানা থাকেনি।


অমিত রায়ঃ অমিত রায় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। নিজস্বতা বিশ্বাস করেন। নিজের মতামত তুলে ধরেন খুব স্বাচ্ছন্দ্যে। আশে পাশের মানুষগুলোর বিপরীত বক্তব্যই তার। অমিত রায়ের বিশ্বাস তাকে কোনো নারী বা কোনো কিছুই আকর্ষন করে না বরং সেই সবাইকে আকর্ষিত করে। তবে তার বিশ্বাস যে ভুল সেটা তো প্রমানিতই।


লাবণ্যঃ লাবণ্য জ্ঞান পিপাসু। মস্তিষ্ক,শরীর, মন সবকিছুই জ্ঞান কেন্দ্রিক। এই ধরনের মানুষ গুলো পড়াশোনা, বই-পুস্তক এবং ডিগ্রি দিয়ে নিজের চারপাশে এমন একটা প্রলেপ বা আস্তরণ তৈরি করে যা গলিয়ে প্রেম, ভালোবাসা ভিতরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে শোভনলাল ভালবাসছেন ঠিকই তবে পড়াশোনা ডিগ্রি গলিয়ে মনে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। তবে অমিত পেরেছে লাবণ্যের সেই দেয়াল বা প্রলেপ গলিয়ে লাবণ্যের মনে নিজের অবস্থান তৈরি করতে। বলা যায় একপ্রকার জোর করেই যা লাবণ্য ঠেকিয়ে রাখতে পারে নাই।মাঝবয়েসী বাবার বিয়ে, পিতৃ সম্পত্তি ত্যাগ, পরিচিত পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া এই ব্যাপার গুলো লাবণ্যের প্রলেপ গলাতে পরোক্ষ ভাবে সাহায্য করেছে অমিতকে।তবে যেভাবে বিলেতি অমিতের সাথে লাবণ্য নিজেকে এক্সপ্রেস করেছে, যেভাবে কাব্যের লড়াইয়ে, প্রেম-ভালবাসা সম্পর্কিত কথোপকথন গুলো চালিয়ে গেছেন সেগুলো প্রশংসনীয়।


পাঠ শেষে প্রতিক্রিয়া: 

'শেষের কবিতা' রবিঠাকুরের শেষের দিকে কবিতা। বইয়ের প্যাটার্ন ভালোভাবে খেয়াল করলে লক্ষণীয় যে এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী রচনা তাঁর। গভীরভাবে নজর দিলে বুঝা যায় এতে ভাববার মত প্রচুর উদ্ধৃতি আছে ।  উপন্যাসে লেখক অমিতের দিকে একটু বেশি নজর দিয়েছেন। পুরো উপন্যাসে তিনি অমিতের অভ্যাস, দর্শন, মনস্তত্ত্বের দিকে জোর দিয়েছেন। নায়ককে এত বেশি হাইলাইট করার নজির বাংলা সাহিত্যে কমই দেখা যায়।  উপন্যাসের চরিত্রগুলোও অমিতের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষিত হয়েছে।  কেটি মিত্তির, নরেন, সিসি, লিসি, যোগমায়া, শোভনলাল- প্রত্যেকটি চরিত্রকে লেখক পরিচয় করিয়েছেন অমিতের নজরে।


বই: শেষের কবিতা

লেখক:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধরণ: কাব্যধর্মী উপন্যাস

1 মন্তব্যসমূহ

  1. চমৎকার রিভিউ, রিভিউ পড়েই বইটি পড়ার আগ্রহ কয়েকগুণ বেড়ে গেল।

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন