মসলার যুদ্ধ- Moslar Juddho বইয়ের রিভিউ।। সত্যেন সেন

মসলার যুদ্ধ। নাম শুনলেই একটু কেমন যেন লাগে। আজব টাইপের। কিন্তু বইটা মোটেও আজব টাইপের নয়। বরং আমাদের এই ভারতবর্ষের ইতিহাসের সাথে, কলোনিয়াল ইতিহাসের সাথে খুব ওতোপ্রোতোভাবেই জড়িয়ে আছে মসলার নাম। লেখক সত্যেন সেন নিজের নিরেট আঁটসাঁট গাঁথুনির লেখনি দিয়ে অতি অল্প ভাষায় সহজে সেই মসলা বাণিজ্য, আর এ নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির  ইতিহাসটাকে তুলে ধরেছেন একদম আমাদের চোখের সামনে।

বই: মসলার যুদ্ধ



কাহিনি সংক্ষেপ: 

▪️ভারতবর্ষ ও ইন্দোনেশিয়া দীপপুঞ্জের ইতিহাসে মসলার ভুমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য। এখানকার মসলা পরস্পর তিনটি ইউরোপীয় শক্তি তথা পরতুগীজ,ডাচ,ও ইংরেজদের কে আকর্ষণ করে নিয়ে এসেছে। বানিজ্য করতে এসে এরা শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করে বসলো।এই মসলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে কত শক্তির পতন ঘটেছে। বণিকদের মুনাফার তৃষ্ণা মিটাতে গিয়ে কত মানুষ প্রাণ দিয়েছে।তাদের রক্ত তিন সমুদ্রের জলে মিশে আছে।এই মসলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে কত দেশ তাদের স্বাধীনতা হারিয়েছে, কত মানুষের মর্যাদা ধুলায় লুন্ঠিত হয়েছে,এমনকি হজ্জ যাত্রিদের জাহাজ কেও আগুনে পুড়িয়ে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই মসলার যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার উপর কঠিন আঘাত হেনেছে।যে চাষিরা মসলা উৎপন্ন করতো,তাদের জমি আর স্বাধীন জীবিকা থেকে উচ্ছন্ন করে দিয়ে নিঃসম্বল কুলিতে রুপান্তরিত করেছে। তাদের সম্পদ তাদের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


_এই মসলার যুদ্ধ রক্তাক্ত, হিংস্র, বীভৎস! আবার এই মসলার যুদ্ধই প্রাচ্যের পরিবর্তনহীন পশ্চাৎমুখী সমাজের সামনে বিশাল বিশ্বের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বদ্ধ জীবনের উপর দুরন্ত ঝটিকার আলোড়ন জাগিয়েছে,প্রচন্ড অত্যাচারের শক্তি সপ্ন দেখা ঘুমন্ত মানুষকে চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে তুলেছে! 

ওটাও সত্য,এটাও সত্য,কোনটাই মিথ্যা নয়।


পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ 

লেখক সত্যেন সেন খুবই সহজ ও সাবলীল ভাষায় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় তুলে ধরেছেন পাঠক সমাজের কাছে। বইটা পুরোটাই একটা ইতিহাসের বই। যদিও সাইজে বেশ ছোট তবুও যারা থ্রিলার, টান টান উত্তেজনাপূর্ণ লেখা পড়তে চান তাদের কাছে এক ঘেয়েমি লাগতে পারে। তবে ইতিহাস জানার আগ্রহ থাকলে বা পড়তে চাইলে আদর্শ একটা বই। শক্তিশালী পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে যখন কালিকটের যোদ্ধারা জয়ী হল তখন যেন এরকমটাই অনুভুত হল: কি হিন্দু, কি মুসলমান- প্রতিবেশি রাজ্যগুলোর মধ্যে একটিও এই চরম দুর্দিনে কালিকটের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। তবু কেমন করে এই আশ্চর্য ঘটনা ঘটাল, ভাবলে অবাক হয়ে যেতে হয়। নির্ভীক দেশপ্রেম আর আক্রমণকারী নৃশংস শত্রুর প্রতি তীব্র ঘৃণা ছাড়া আর কী তাদের সম্বল ছিল? আর সেই দেশপ্রেম এতই গভীর যে, তার সামনে হিন্দু আর আরবীয় ভেদ-বুদ্ধি তুচ্ছ হয়ে মিলিয়ে গেল। দীর্ঘদিন ধরে এই ঐক্যকে তারা দৃঢ়ভাবে বেঁধে রেখেছিল, ধন্য তাদের দেশপ্রেম।


বইটি পড়ার পর মনে মনে একটা আফসোস হয় আমার। মনে হয়, পুরো ভারতবর্ষ এত্ত ঐশ্বর্য পূর্ণ হয়েও শুধুমাত্র নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্ব আর কোন্দলের কারণে, প্রথমে ডাচ এরপরে ব্রিটিশদের কলোনিতে পরিণত হয়। ডাচ কলোনি বলতে গেলে কোনো প্রভাবেই ফেলতে পারেনি উপমহাদেশের উপর। কিন্তু ডাচদের হটিয়ে ওদের দেখানো পথে হেঁটেই ইংরেজরা আমাদের এই পুরো ভারতবর্ষ কে দুইশ বছর শাসন করলো এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা দিলেও ভাগ করে দিলো দুইটি রাষ্ট্রে।



▪️এই ইতিহাস গুলো প্রায় অনেকেরই জানা কিংবা অনেকের অজানা। ইতিহাস টি সাংস্কৃতিক এবং রাজনীতিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে কাজ করেছে। তাই আমি মনে করি কিছু কিছু হলেও আমাদের জানা আবশ্যক। (ব্যক্তিগত মতামত)


📗বই_ মসলার যুদ্ধ

🖋️লেখক_ সত্যেন সেন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন