আমি তপু- Ami Topu।। জাফর ইকবাল বইয়ের রিভিউ

এ পৃথিবীর যেকোনো মানুষের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় তাকে কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে ?সাথে সাথে সবার স্মৃতিতে একজনের নামই  ভেসে আসে আর তিনি হলেন মা। কিন্তু যখন মা-ই  সবথেকে বেশি আপনাকে  ঘৃণা করে তখন তার থেকে মর্মান্তিক আর কি হতে পারে? 

বইঃ আমি তপু


কাহিনি সংক্ষেপ: 

'আমি তপু'র গল্পের শুরুটা একটা সাধারণ পরিবার নিয়ে। যেখানে রয়েছেন বাবা, মা, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তপু পরিবারের ছোট ছেলে, বলতে গেলে আদুরেও।

তবে সুখী পরিবারটিতে বিপদ আসে একদম হঠাৎ করেই।

একদিন তপুর বায়না পূরণ করতে গিয়ে সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তপুর বাবার। তার বাবার এই মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি তপুর মা ও অন্যান্যরা। যার ফলশ্রুতিতে তপুর সাথে অসহনীয় মন্দ ব্যবহার শুরু করে তপুর মা। ভাই বোনেরাও তপুর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই অবস্থায় তপুর ওপরও এর প্রভাব পরে।

তার পরীক্ষার ফলাফল ও বন্ধুদের সাথে ব্যবহার দুটোই খারাপ হতে থাকে। যার জন্যে তার সাথে কেউ মিশত না। এমন সময় তপুর সাথে দেখা হয় প্রিয়াংকার। প্রিয়াংকা মেয়েটা ছিল একটু অন্যরকম। সে তপুকে মোটেই অন্যদের মতো ভয় পেত না। বরং তপুর সাথে সে বন্ধুত্ব করতে উদ্ব্যত হয়। একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরে তপু তার মার তীব্র খারাপ ব্যবহারের সম্মুখীন হয়। যা সহ্য করতে না পেরে সে বাড়ি ছাড়ে। ঠিক এমন সময় তপুর বাসায় এসে হাজির হয় প্রিয়াংকা।

সে তপুর জীবনের দুঃসহ স্মৃতি জানতে পারে এবং প্রাণপণে ছোটে তপুকে।ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে।  এত বড় ঢাকা শহরে সেদিন তপুকে খুঁজে পেয়েছিল প্রিয়াংকা।

সে তাকে বহুকষ্টে রাজি করায় বাড়ি ফিরতে। তার সাথে সে তপুকে উপহার হিসেবে দেয় একটা অংকের বই। তপু প্রিয়াংকার সাথে বন্ধুত্বে জীবনে নতুন আশা লাভ করে। এরপর থেকে সে প্রায়ই অংকের প্রতি মনোযোগ দিত।

তপুদের স্কুলে হঠাৎ একদিন গণিত অলিম্পিয়াড এ অংশগ্রহণে ছাত্রছাত্রীদের নামের তালিকা চাওয়া হয়। প্রিয়াংকার তপুর মেধার উপর বিশ্বাস ছিল। তাই সে তপুরও নাম দিয়ে দেয় সেই তালিকায়। দেখতে দেখতে চলে এলো প্রতিযোগিতার দিন। পরীক্ষা হল।

পরীক্ষা শেষে সবাই বেরুলো। প্রশ্ন বেশ সোজা ছিল। উৎসাহিত হয়ে প্রিয়াংকা তপুকে জিজ্ঞেস করল সে কয়টা অংক করে আসছে পরীক্ষায়। পু বলল মাত্র একটা!

এটা শুনে হতাশ হয়ে পরল প্রিয়াংকা, তার সব পরিশ্রমই হয়তো বৃথা যাবে! একে একে সব ক্যাটাগরীতে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা হল। এবার বাকি সেরাদের সেরার নাম ঘোষণার পালা। 

মঞ্চ থেকে 'আরিফুল ইসলাম তপু' নামটা ঘোষণা হওয়া মাত্র উঠে দাঁড়াল প্রিয়াংকা। তার আনন্দের যেন বাঁধ ভেঙেছে। 

--সে পেরেছে। 

--হ্যা, সে পেরেছে। 

--গত কয়েকবছরে এমন সুন্দর দিন হয়তো আর দেখেনি তপু। 

--মঞ্চ থেকে ঘোষণা আসল অন্যসব অংকে নাম্বার ছিল এক করে।

--তপু যেটা করেছে সেটার দশ!

--বড় বড় গণিতবিদের এটা করতে দিন পেড়িয়ে যায়, তপু সেটা করেছে মাত্র এক ঘণ্টায়! তপুকে ঘিরে ধরল সাংবাদিকেরা। দেশজুড়ে চলছে তপু বন্দনা। বাড়িতে ফিরে তপু আবার আগের পরিস্থিতির সামিল। তার বাসা তখনো বাড়ির রান্নাঘরে। 

তার মুখ দেখেনা বাড়ির কোন সদস্যই। সেদিন বিকেলে তপুদের বাড়িতে আসে তার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। সাথে অসংখ্য সাংবাদিক। তপুর মার কাছে তখনো সব পরিস্কার নয়। ম্যাডাম তাকে টিভি চালাতে বললেন। 

এরপর যা হল তার জন্যে তপুর মা হয়তো নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলেন না। সাংবাদিকেরা একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিতে থাকল। প্রসংশার জোয়ারে ভাসছিল তপুদের পরিবার। এবার নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না তপুর মা।

শেষভাগে মা আর ছেলের মিলটা গল্পের আবেগী ভাবকে শুধু পরিপূর্ণতা দেয়নি, গল্পটাকে করে রেখেছে কালজয়ী! এছাড়াও গল্পে তপুর উপর ঘটা মানসিক নির্যাতন, বাড়ির কাজের বুয়ার তপুর পক্ষে দাঁড়ান, তপুর সাথে ইঁদুরের বন্ধুত্ব ও তপুদের স্কুলের হিন্দুবিদ্বেষী বাংলা স্যারের কথা গল্পটিকে অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। 

এই বইটা পড়ে দেখলে নিঃসন্দেহে পাঠকের সময়টা ভাল কাটবে, শেষ ভাগে টিস্যু পেপারের সাথে পাঠকের সম্পর্ক হওয়াটাও প্রায় নিশ্চিত।


লেখক পরিচিতিঃ

মুহম্মদ জাফর ইকবাল (জন্ম: ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫২) হলেন একজন বাংলাদেশী কথাসাহিত্যিক ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখক, কলম লেখক, পদার্থবিদ, শিক্ষাবিদ । তার লেখা কিছু উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের একজন অধ্যাপকএবং ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত একই বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশল বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের অক্টোবরে তিনি অবসরে চলে যান। তিনি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ক্যলিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনলজি ও বেল কমিউনিকেশনস রিসার্চে ১৮ বছর কাজ করার পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হন।


উপন্যাসের শিক্ষা:

একজন মানুষ সে ছোট হোক কিংবা বড় তার জীবনে পরিবারের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা এই উপন্যাসটি পড়ে অনুধাবন করা যায়। 

ভুল বুঝে কাউকে দূরে ঠেলে দিয়া কোনো কিছুর সমাধান করা যায় না।প্রতিভার বীজ সবার মাঝেই সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ। জন্মগতভাবে কেউ খারাপ হয় না এটি বুঝতে হবে। এই উপন্যাস আমাদের সকলের মাঝে এই অনুভূতির জন্ম দেয়।


বই      : আমি তপু

লেখক: মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

শেণী   : কিশোর উপন্যাস

প্রকাশক: পার্ল পাবলিকেশন্স

মূল্য   : ১১০ টাকা

পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১১০

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন