পুতুল নাচের ইতিকথা - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বইয়ের রিভিউ

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জীবনে যত রচনা লিখেছেন, তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে পুতুলনাচের ইতিকথা অন্যতম। শুধু তাঁর নয়, পুরো বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ট উপন্যাসগুলোর শুরুর সারিতে অবস্থান এই উপন্যাসটির। মানুষের মনের যতটা গভীরে প্রবেশ করা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক ততটুকু গভীরে যেয়েই এই উপন্যাসের বীজ বুনেছেন।

বইঃ পুতুলনাচের ইতিকথা


'পুতুলনাচের ইতিকথা' মানিক বন্দোপাধ্যায়ের এক অভিনব সৃষ্টি। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রাম্যডাক্তার শশীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের লেখায় গ্রাম্যপ্রকৃতি, গ্রামের মানুষের জনজীবন, তাদের বিশ্বাস -মূল্যবোধ, নারী জীবনের কিছু অপূর্ণতা, গ্রাম্য সংস্কার সবই এখানে উঠে এসেছে। গ্রাম্য জীবনবোধের এমন কোনো দিক নেই যেদিকে তিনি স্পর্শ করেন নি তার এই উপন্যাসের মাধ্যমে৷


কাহিনী সংক্ষেপঃ

উপন্যাসের চরিত্র শশী, যার ডাক্তারি জীবন হঠাৎ করে বদলে যায় চোখের সামনে মৃত হারু ঘোষকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তার চোখে না পড়লে যে কতদিন লাগতো কারোর নজরে আসতে, ততদিনে শেয়াল যে কী অবস্থা করে ফেলত মৃত হারুর, এই চিন্তা শশীর মনে একটা আলাদা রকমের প্রভাব বিস্তার করে। সাব কনসাস মাইন্ডে এই ঘটনাটাই যেন আলাদা একটা ছাপ ফেলে দেয়, অন্তত পাঠক হিসেবে আমার মনে তো জায়গা করে নিয়েছিল ঘটনাটা।

তারপর থেকেই কি শশী মৃত হারুর পরিবারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিতে চাইলো? অনেকটা নিজের অজান্তেই? কে জানে। হারু ঘোষকে নিজে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে না আসলে কি তার পরিবারের সাথে এতটা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়তো শশী?

আরো পড়ুনঃ শেষের কবিতা- Shesher kobita বইয়ের রিভিউ।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হারুর পরিবারে সদস্য বলতে তার বিধবা বউ মোক্ষদা, ছেলে পরান, ছেলের বউ কুসুম, মেয়ে মতি, বুচি, বুঁচির পিসি আর ছেলে। সংসারের হাল পরান একা সামলাতে পারে না, সব কিছুতে তার শশীর বুদ্ধি নেয়া চাই। মতির বিয়ে থেকে শুরু করে সবকিছুতে শশীর মতামতের দাম অন্যরকম। অবশ্য পরানের বউ "ছোটবাবুর" ধার ধরে না। ২৩ বছর বয়সের বাজা মেয়েটার বিয়ে হয়েছে আজ সাতটা বছর। তার সাথে আমাদের শশীর সম্পর্ক ঠিক কেমন,উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত সেটা ঠিক করে ঠাহর করা দায়। কুসুম আর শশীর মধ্যে যে একটা নিষিদ্ধ সম্পর্ক, সেটা এত সুন্দর করে বর্ণনা করেছেন মানিক, যে সেটাকে নিষিদ্ধ ভেবে নিতেও পাঠকের মনে বাঁধবে। কুসুম ভালোবেসেছে শশীকে, কিন্তু শশী কি কখনো তার যোগ্য মূল্যায়ন করতে পেরেছে? যখন কুসুমের মন প্রেমে পরিপূর্ন, তখন তাকে বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে সে। কিন্তু কাহাতক এমন ফিরিয়ে দেয়া মেনে নেয়া যায়? কুসুম তাই গুছিয়ে নেয় নিজেকে, সে ছেড়ে যাবে এই গ্রাম, শশীকে। কোনোভাবেই তাকে আর ফেরানো সম্ভব না।

কুসুমের ননদ মতি। ছোটবাবু বলতে সে পাগল, এই নিয়ে বৌদি তাকে কম জ্বালাতন করে না। কিন্তু শীতলবাবুর বাড়িতে বসা যাত্রার রাজকুমার প্রবীর যে তার মন জয় করে নিয়েছে, সে বুঝবে কে? রাজকুমার প্রবীর আসলে শশীর কলকাতার বন্ধু কুমুদ। জীবন নিয়ে যার প্রবল উচ্চাশা, যার জ্ঞানের কাছে কিছুটা মাথা নত করেই থেকেছে শশী, সে হঠাৎ কেন যাত্রায় যোগ দেয়, সেই রহস্য শশীকে একরকম আচ্ছন্ন করে দেয়। এই রাজকুমার প্রবীর আচ্ছন্ন করে আরেকটা মানুষকে, কিন্তু একেবারে অন্যরকম ভাবে, সে মানুষ মতি। কানের সোনার মাকড়ি গড়িয়ে দেয়া রাজকুমার ঘোড়ায় চেপে তাকে নিয়ে যেতে আবার ফিরে আসে, কিন্তু জীবন কি কখনো কল্পনার মত সুন্দর হয়? এই চিন্তায় শশী জর্জরিত হলেও মতিকে সে কথা বোঝাবে কে? সে তার রাজকুমারের সাথে কলকাতা চলে যায়, নতুন সংসার শুরু করে, যে সংসার তার কল্পনার থেকে অনেক অনেক আলাদা। কিন্তু গ্রামের মেয়ে মতিকে কুমুদ ঠিক গড়ে নেয়, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে না, কথার জোরে। আর? কে জানে, কিভাবে কুমুদ মতিকে তার প্রিয় মানুষগুলোর থেকে দূরে নিয়ে নিজের প্রতি আসক্ত করে দেয়, এটা বুঝতে পারা কিন্তু এত সহজ নয়। 

শশীর বাড়ির পাশে যাদব পণ্ডিত আর পাগলদিদির জরাজীর্ণ বাড়ি। সবাই যাদব পণ্ডিতকে সিদ্ধি প্রাপ্য বলে সম্মান করে। সূর্যবিজ্ঞান যাদবের ধ্যান জ্ঞান। সেই যাদব কথাচ্ছলে শশীকে বলে ফেলেন, তার মৃত্যু হবে রথের দিন। কথা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। মানুষের মন কি অদ্ভুত, একজন মানুষ রথের দিন মারা যাবে, এই ঘটনায় সবাই যেন মজা পেয়ে যায়। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে যাদব পণ্ডিত, সবাই তার স্বেচ্ছামৃত্যু দেখতে ভিড় জমায়, যাদব পণ্ডিত আর পাগলদিদির মৃত্যু যেন মানুষের মনে নতুন রং ছড়িয়ে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনার বর্ণনা এমন সুন্দর আর নিখুঁত ভাবে করেছেন, ভাবতেই অবাক লাগে মানুষ মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই কতোটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে।

আরো পড়ুন: অপরাজিত উপন্যাস রিভিউ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়


বিজ্ঞানমনস্ক ডাক্তার শশী যেখানে যাদব পণ্ডিতের স্বেচ্ছামৃত্যু বা সূর্যবিজ্ঞানকে কখনো সমর্থন করে নাই, তাকেই জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দান করে যান যাদব পণ্ডিত, হাসপাতাল বানানোর উদ্দেশ্যে। সেই হাসপাতাল নিয়ে শশীর কত ব্যস্ততা। পরানকে আর সময় দেয়া হয় না, কুসুমের বাড়ি যাওয়া হয় না। যেন হাসপাতাল একটা বিন্দু, তাকে কেন্দ্রে রেখেই আবর্তিত হচ্ছে শশীর জীবন।


আরো আছে সেনদিদি। যার সাথে শশীর বাবা গোপাল কে নিয়ে কানাঘুষো বহুদিন থেকে। ছেলের জন্ম দেয়ার সময় মৃতপ্রায় সেনদিদির প্রতি শশীর যে বিতৃষ্ণা, বাবার সাথে মনোমালিন্য, সদ্য জন্মানো বাচ্চাটার প্রতি শশীর অদম্য রাগ, সব যেন মানুষের মনের একেকটা লুকানো রূপের বহিঃপ্রকাশ। মানিক এসব ফুটিয়ে তুলেছেন, তাঁর অদ্ভুত জাদুকরী লেখনীর জোরে।


◾শেষ কথা:

পুতুলনাচের ইতিকথা এমন একটি উপন্যাস, আনাড়ি পাঠকের হাতে লেখা রিভিউ তার বিশালতা বর্ণনা করতে অক্ষম। কখনো এই উপন্যাস আমাকে হাসিয়েছে, বিন্দুর পরিস্থিতি পড়ে জীবন সম্পর্কে ভাবিয়েছে, জয়ার কথা শুনে নতুন ভাবে জীবনকে দেখতে শিখিয়েছে, মাঝে মাঝে শশীর প্রতি সহানুভূতি অনুভব করিয়েছে। এই উপন্যাসটি একই সাথে অনেক গল্প বলে, যারা সবাই একইসাথে জড়িয়ে আছে। কাল্পনিক হলেও উপন্যাসটির প্রতিটা লাইনে বাস্তবতা মিশে আছে। এতগুলো গল্পের ভীড়ে সবার গল্পই আসলে একটা বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, কিংবা কে জানে, কেউ ঘুরাচ্ছে। যেমনটা শশী তার বোনকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পায়,


"খুকি, বড়ো হয়ে তুই কি করবি?
পুতুল খেলবো"


বইয়ের নাম: পুতুলনাচের ইতিকথা

লেখক: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রকাশক: শিক্ষা প্রচার

মুদ্রিত মূল্য: ২৪০ টাকা

পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৮৭

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ