পথের পাঁচালী-Pather Panchali বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বই রিভিউ

পথের পাঁচালী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কালজয়ী উপন্যাস যা ব্যাপকভাবে বাংলা সাহিত্যে একটি ক্লাসিক হিসাবে বিবেচিত হয়।  ১৯২৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়ে, উপন্যাসটি সময় এবং সংস্কৃতিকে অতিক্রম করেছে এবং ইংরেজি সহ অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে।  নামকরণের দিক দিয়ে “পথের পাঁচালী”, বইটির একটি উপযুক্ত নাম ; গ্রামীণ বাংলার মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের মর্মস্পর্শী যাত্রা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে।


কাহিনী সংক্ষেপ:

উপন্যাসের প্রথম অংশে দুটি কুসংস্কারের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে। একটি হচ্ছে বাল্যবিবাহ, অপরটি যৌতুক প্রথা। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় এ দুটি কুসংস্কারের ভয়াবহ রূপ বর্ণিত হয়েছে এখানে। যৌতুকের কবলে পড়ে নারীকে অবহেলিত, নির্যাতিত, অপমানিত, নিপীড়িত হওয়ার দৃশ্য ফুটে উঠেছে। উপন্যাসের দ্বিতীয় অংশে ‘আম আঁটির ভেঁপু’-এ হরিহরের সন্তানদ্বয়ের (বড় মেয়ে দুর্গা ও ছোট ছেলে অপু) দুষ্টুমিষ্টি একটা সম্পর্ককে দেখানো হয়েছে। গল্পের এক পর্যায়ে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে আম চুরি করে খাওয়ার ঘটনা বলে দেওয়ার জন্য দুর্গা অপুকে বেধড়ক পেটায়। প্রতিবেশীরা তখন তাঁকে ( দুর্গা) ইচ্ছেমতো কথা শুনায়। পরবর্তীতে দুর্গার মা সর্বজয়া রাগান্বিত হয়ে ওকে বকাবকি করেন। অতঃপর গল্পের এক পর্যায়ে এসে ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুর্গা মারা যায়।

উপন্যাসের শেষ অংশ ‘অত্রুর সংবাদ’-এ চিরাচরিত বাংলায় বড়লোক-গরীবের বৈশিষ্ট্যের কথা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বর্ণিত হয়েছে।

অপু-দুর্গা ছাড়াও উপন্যাসে ছিল হরিহর, সর্বজয়া, নীরেন, লীলাদি, সেজ ঠাকরুন, অজয়, গুলকিসহ আরও অনেকেই। যারা একে অপরের সাথে বিভিন্নভাবে সম্পর্কিত। তাঁদের অনেক কেই লেখক শুধুমাত্র চরিত্রের প্রয়োজনে না এনে বাস্তব জীবনের বর্ণনার জন্য এনেছেন। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসটিতে সাধু ও আঞ্চলিক ভাষার অসম্ভব সুন্দর সমন্বয় দেখিয়েছেন লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যােপাধ্যায়। লেখকের শব্দ প্রয়োগের দক্ষতা এতটাই দৃঢ় ছিল যে, উপন্যাসটি পড়ার সময় মনে হয়েছে, বাস্তব জীবনের কতগুলো চিত্র রং তুলি দিয়ে আচড় কেঁটে কেউ চোখের সামনে তুলে ধরেছে। শিশুর চোখে জগৎকে দেখার আশ্চর্য বর্ণনা উঠে এসেছে লেখকের কলমের ডগায়। উপস্থাপনা শৈলী এতটাই চমকপ্রদ ছিল যে, পড়তে যেয়ে কখনোই একঘেয়েমি মনে হয়নি আমার।


পথের পাঁচালী বইয়ের ছবি


📖 পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ-

সাহিত্যের জগতে শরৎচন্দ্রের মতাে বিভূতিভূষণের আগমন আকস্মিক ও বিস্ময়কর। দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সত্য-মিথ্যার সংশ্লেষণের

বিভূতিভূষণ মানব জীবনকে বেঁধেছেন প্রকৃতির সাথে। শিশু মনের দুৰ্জেয় রহস্যময়তা, শৈথিল্যহীন আবিষ্কারের নেশা, নতুনকে জানার ব্যাকুলতা ‘পথের পাঁচালী’র নায়ক অপুর মাধ্যমে তিনি যেভাবে দেখিয়েছেন, বাংলা সাহিত্যে তার দ্বিতীয় নজির নেই।

বিভূতিভূষণ তাঁর লেখা এই কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের  পাঁচালী' কোনো রুম নির্ভর করে লেখেনি। গ্রাম্য জীবনে সকল সমস্যা,

মনস্তত্ত্ব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, নরনারীর প্রেম-মিলন-বিরহ, সামাজিক-পারিবারিক সংঘাত-সংঘর্ষ, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনীতি, নৈতিকতা-কাহিনি রচনার এতসব উপাদান উপন্যাসে অনুপস্থিত। পাপ-পুণ্য ও ভালাে-মন্দের সমান্তরালে থেকেও সত্য-সুরটি বিধৃত হয়েছে এতে। লেখকের পল্লীপ্রকৃতি, দিগন্তস্পর্শী অরণ্য, আকাশের হাতছানি পাঠককে নিয়ে যায় স্বপ্নের অমরাবতীতে। প্রকৃতি বিভূতিভূষণের কাছে জীবনেরই অচ্ছেদ্য অংশ। তাই কোনাে সংজ্ঞা-নিবন্ধ প্রকৃতি-দৃষ্টি তাঁর নেই।


বইয়ের নাম: পথের পাঁচালী

লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রকাশনী: রহমান বুকস্ 

ধরণ: চিরায়ত উপন্যাস

প্রচ্ছদ মূল্য: ২০০ টাকা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ