আদর্শ হিন্দু হোটেল - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় Adarsha Hindu Hotel বই রিভিউ

একটা কথা আছে বাংলায়,"মানুষ তার স্বপ্নের সমেত বড়"।আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি।স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি।স্বপ্ন নিয়েই বাঁচি।স্বপ্নকে পূর্ণ করার চেষ্টা করি।কিন্তু সেই স্বপ্ন ক'জনই বা স্বার্থক করতে পারি? হ্যা সেরকম একজন স্বপ্নবিলাসী মানুষ "হাজারী চক্রবর্তী",তাকে ঘিরেই লেখা হয়েছে "আদর্শ হিন্দু হোটেল"।

        • বই:আদর্শ হিন্দু হোটেল


🌓🌓 কাহিনী সংক্ষেপে:- 

রাণাঘাটের রেল বাজারে বেচু চক্কত্তির " আদর্শ হিন্দু হোটেল" বিখ্যাত হোটেল। এ হোটেলে রাধুনি বামুনের কাজ করে হাজারী ঠাকুর। মাসিক সাত টাকা এবং দুবেলা খেতে পায় হোটেল থেকে। রাত্রে হোটেলেই ঘুমায় সে। তার বাড়ি এঁড়শোলা গ্ৰামে। গ্ৰামে তার স্ত্রী , মেয়ে টেঁপি ( আশালতা) থাকে। সেখান থেকে এসে বেচু চক্কত্তির হোটেলে কাজ শুরু করেছে সে সাত বছর আগে। 

বেচু চক্কত্তির হোটেলের উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান হাজারী ঠাকুর এর ই । তার মত ওস্তাদ বামুন রাণাঘাটে আর কেউ নাই। যারা একবার তার হাতের রান্না খেয়েছে , তারা বারবার এসেছে তার রান্না খাওয়ার জন্য। প্রতিবারই লোকজন এসে তার হাতের রান্না খেয়ে প্রসংশা করে যায়। হোটেলের একজন বাদে সবাই তাকে ভালো জানে  , হাজারী ঠাকুর মানুষটাও‌ আগাগোড়া ভালো। হোটেলের একজনই তাকে দেখতে পারে না , পদ্ধ ঝি । হাজারী ঠাকুর তাকে পদ্ধদীদী বলে ডাকে। এই পদ্ধ ঝির কথাই হোটেলের শেষ কথা। এমনকি বেচু চক্কত্তিও‌ তার কথার উপর কথা বলে না। বেচু চক্কত্তির সাথে তার কোন সম্পর্ক আছে কিনা ,এ নিয়ে লোকজন বহু কথা বলে। 

পদ্ধ ঝি পদে পদে হাজারী ঠাকুর কে অপমান করে। বেচু চক্কত্তির কাছে হাজারী ঠাকুর সম্পর্কে বহু মিথ্যাচার করে তাকে অপদস্থ করে প্রায়শই । এমন এমন কথা বলে যে হাজারী ঠাকুর না কেদে পারে না। পদ্ধ ঝির কারনে প্রায়শই হাজারী ঠাকুর কে না খেয়ে থাকতে হয়। এ নিয়ে হাজারী ঠাকুর এর কোন অভিযোগ নেই। সব মিথ্যা অপবাদ সে মাথা পেতে নেয়। পদ্ধ দীদীকে সে ভিষন ভয়ও পায়। 

ঠাকুর মশায়ে খুবই স্বপ্ন একটি বড় হোটেল খুলবার। চারশো টাকার মতো হলেই সে তার স্বপ্নের হোটেল খুলতে পারবে। কিন্তু টাকা দেবে কে? অবশ্য তাকে ৩ জন টাকা দিতে চায়, কিন্তু সে নেয় না। কারন যারা টাকা দিতে চায় তারা তার মেয়ের সমতুল্য। তাদের টাকা নিয়ে হোটেল খুলে , পড়ে লোকসান হলে কি হবে? কে তাদের টাকা দেবে। কিন্তু শেষমেশ, তার নিজগ্ৰাম এঁড়াশোলার বড় জমিদার হরিচরণ বাবুর মেয়ে আতসী এর অনুরোধে তার থেকে দুশো এবং আরেকজন আর্থাৎ তার নিজের গ্ৰামেরই এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে রাণাঘাট এ, নাম কুসুম তার থেকে দুশো এই মোট চারশো টাকা নিয়ে সে হোটেল খুলে বসে। এবং ভালো ব্যাবসা হতে থাকে । যার কারনে বেচু চক্কত্তির হোটেল কানা হয়ে যায়। শেষমেশ বেচু চক্কত্তি এবং পদ্ধ ঝিকে হাজারী ঠাকুর এর হোটেলে  রসুয়ে বামুন এর মত কাজ করতে হয় । কি এমন হয় যার জন্য তাদের শেষমেশ হাজারী ঠাকুর এর হোটেলে কাজ করতে হয়??


★বইটি কেন পড়বেন? 


🔹বইটি পড়ে আপনার মধ্যে কিছু ভাবনার উদ্রেক হবে। যেমনঃ

১। কাজে প্রেম থাকলে বয়স কোনো প্রতিবন্ধক নয়।

২। কাজ করার আগে কাজে পরিকল্পনা জরুরি। 

৩। অসচ্ছতা দিয়ে কোনো ভিত প্রতিষ্ঠা করলে তার পতন নিশ্চিত। 

৪। কোনো একটি কাজে অতি পারদর্শিতা থাকলে ও তার নিয়মিত চর্চা হলে সেটাই সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করে।

৫। পরিশ্রম ছাড়া সফলতা আসে না। বইটির এক পর্যায়ে হাজারী বামুনের ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে," সংসারে উন্নতি করিতে হইলে, দেশের কাছে বড় মুখ দেখাইতে হইলে, পরের মুখে নিজের নাম শুনিতে হইলে- সেজন্য চেস্টা চাই, খাটুনি চাই।"

৬। সাহায্যকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ না থাকলে উপরে ওঠা যায় না।  যেমনঃ হাজারি বামুন বেঁচু চক্কোত্তির প্রতি সর্বদা নত ছিলেন।

৭। অসৎ লোককে কর্মভার দিয়ে নিজে সচেতন থাকতে হয়।

৮। গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের দায়িত্ব কখনো অন্যের উপর দেয়া উচিৎ নয়। এ প্রেক্ষিতে বিভূতিভূষণ উল্লেখ করেছেন,"  সে ( হাজারি বামুন) বাজারে গিয়া মাছ তরকারি কিনিয়া আনিবে, এ হোটেলের মত ঝিয়ের উপর সব ভার ফেলিয়া রাখিবে না"

🔹এই বইটি সাধু ভাষায় রচিত হলেও ভাষাগত জটিলতা অর্থাৎ কাঠিন্য  নেই বললেই চলে।

🔹 ঔপন্যাসিকের অসামাণ্য প্লট রচনার ক্ষমতা আপনার সামনে কাহিনীপট এমনভাবে তুলে ধরবে যেনো আপনি নিজেই এই দৃশ্যে উপস্থিত।

🔹উপদেশ এই উপন্যাসের উপজীব্য হলেও এ বইতে এমন প্রাণবন্ত দৃশ্যায়ন করা হয়েছে যে, কোনো পৃষ্ঠায় আপনার বিরক্তিতে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

🔹এ বইয়ের কথাগুলো কেবল কিছু কথা ছিল না এর পেছনে ছিল উপলব্ধির বিশালতা। ঔপন্যাসিক হাজারি বামুন,পদ্মঝি,বেঁচু চক্কোত্তির মতো চরিত্রের মুখ দিয়ে সমাজের ও মানুষের মননের কিছু প্রতীকি সত্য তুলে ধরেছেন, তিনি অনেক লাইনে রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন। তাই অন্যান্য উপদেশমূলক  বই থেকে এটা একদমই আলাদা।

🔹ধরুন,আপনি কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেছেন।আপনার অনুপ্রেরণা প্রয়োজন কিন্তু চারপাশ  থেকে পাওয়া হাজারো উপদেশবানী আপনাকে অসহ্য করে তুলছে। এই অবস্থায় এমন একটি বই আপনাকে ভাবতে বাধ্য করাবে আপনিও চেষ্টা করুন,নিশ্চয়ই সফল হবেন।


★চরিত্রায়ন সম্মন্ধে কিছু বিশেষ ভাবনা:


সব মানুষের মাঝেই কম বেশি প্রভুজ্ঞান বা সমর্পণ থাকে। যখন এটা বেশিরভাগ লোক দেখানো কিছু রেয়াজ হয় তখন তা মানুষকে পরিশুদ্ধ করতে পারে না বরং এই শ্রেণির মানুষ ধর্মাস্ত্রকে ব্যবহার করে অনায়াসে  মিথ্যাচার,অনাসৃষ্টি তৈরি করতে পারে।যেমন:বেঁচু চক্কোত্তি ভগবানের ভোগ খাওয়ানোর নামে সবাইকে ঠকিয়ে বেশি চাঁদা নিত এবং সস্তায় কিছু ভোগ বিতরণ করলেও বাকিটা নিজের পকেটে গুজে নিত।

আবার ভণ্ডমি নয়,প্রভুতে পূর্ণ বিশ্বাস যে মানুষের মাঝে প্রাণশক্তি বাঁচিয়ে রাখে,তাকে সামনে এগোতে উদ্দীপনা জোগায় তার প্রমাণও এ বইয়ে হাজারি ঠাকুরের চরিত্রে খুঁজে পাবেন।


★বইয়ের সমাপ্তি যেমন ছিল:-

বইয়ের সমাপ্তিটা করা হয়েছে অনেক সুন্দরভাবে। তারাহুরা ব্যাতিত ধিরে ধিরে সব বিষয়গলি একত্রে করে দারুনভাবে গল্পের ইতি টানা হয়েছে। যেখানে মনে হবার কোন উপায় নাই যে " গল্পটা যেন শেষ হয়েও হলো না"।


★একনজরে বই পরিচিতি:-


বই: আদর্শ হিন্দু হোটেল 

লেখক:- বিভূতিভূষন বন্দ্যোপাধ্যায় 

প্রকাশনী: নাঈম বুকস ইন্টারন্যাশনাল। 

প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০২১

প্রচ্ছদ: রাজু আহমেদ 

পৃষ্ঠা: ১৬০

মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ