কোথাও কেউ নেই-kothau kew nei বুক রিভিউ

“জানেন বাকের ভাই, আমরা সব সময় ভুল মানুষকে ভালোবাসি”- লাইনটুকু যেখান থেকে পাওয়া, নব্বই দশকের সে সাড়াজাগানো নাটকটির নাম ছিলো ‘কোথাও কেউ নেই।‘ এত বছরেও যেটার জনপ্রিয়তা ঘুচেনি। অবশ্য আজ নাটক না বলব উপন্যাসের কথা। কিছু উপন্যাস থাকে না যা নিয়ে মাতামাতি না করলেও তারা থাকে জনপ্রিয়তা কিংবা পাঠকের চাহিদার শীর্ষে। এ উপন্যাসটি ঠিক তেমন। কোনো রেটিং বা রিভিউ দিয়ে এটাকে বিচার করা যাবে না। উপন্যাসটি থাকবে নিজের রাজকীয় আসনে বছরের পর পছর।

“কোথাও কেউ নেই”

চমৎকার এবং অনেক জনপ্রিয় একটা বই। উপন্যাসের কঠিন মনের মানুষ হিসেবে আমার মুনা চরিত্রকে দেখতে পাই লাগে।

বাকের ভাইয়ের কিছু হাস্যরস,মুনার ব্যাক্তিত্ব,পারিবারিক টানাপোড়ন,অসুস্থ রাজনীতি, বিত্তের বৈভব মনে বারবার দাগ কাটে।

সবশেষে মুনার একাকিত্ব। সবশেষে মনে হবে সত্যি যেন কোথাও কেউ নেই!


কাহিনি সংক্ষেপ-

গল্পটার মূল চরিত্র মুনা। বাস্তবিক, স্ট্রং, হার না মানার মানসিকতা, প্রবল আত্মসম্মানবোধ এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের এক মেয়ের চরিত্রে হাজির হয় মুনা। ছোটবেলায় মা-বাবা হারানোই মুনার বেড়ে ওঠা মামার কাছে। ছোটবেলায় বাবা-মামা হারানো, এরপর একে একে না নিজের জীবনে প্রতিটি চাওয়াগুলো না পেতে পেতে মুনাকে নিজেকে কাটখোট্টা বাস্তববাদী বানিয়ে ফেলেছে। মামা-মামী, মামাতো বোন বকুল,আর মামাতো ভাই বাবুকে নিয়েই মুনার এখনকার পরিবার। একটা পর্যায়ে এসে মুনা প্রবল প্রেমে পড়ে যায় হাসান সাহেবের। সে কী গভীর প্রেম! কথায় আছে না- অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়। সেই মতোই আজীবন ভালোবাসার কাঙাল মুনার সে ভালোবাসাটুকু জোটেনি, খুব কমদিনের ব্যবধানে সম্পর্ক ভেঙে যায় হাসান সাহেবের সাথে। উপন্যাসের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বাকের ভাই। সে এলাকাতে ছোটোখাটো গুণ্ডা হিসেবে পরিচিত, জেলেও যেতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। মুনার প্রতি তার ভালোলাগা ছিলো অসীম কিন্তু কখনও প্রকাশ করেনি। বিপদে আপদে সবসময় মুনার পাশে থেকেছে সে। কিছুটা সময় পার হওয়ার কর মুনাও বুঝতে পারে বাকের ভাইকেই তার পছন্দ নিজেও ভালোবেসে ফেলে বাকের ভাইকে। কিন্তু এখন কি চাইলেই তাকে পাওয়া সম্ভব!

বাকের ভাইকে মিথ্যে মামলার জের ধরে নিয়ে যাওয়া হলো ফের জেলে। প্রথমে মামী মারা গেল, তারপর মামা মারা গেল, বকুলের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর অন্যত্র চলে গেল সাথে বাবুও চলে গেল। আর শেষ যাকে নিয়ে একসাথে থাকার আশা বুনেছিল সে বাকের ভাইও জেলে বন্দি। এ পৃথিবীতে মুনা হয়ে পড়লো একলা একা, যার কোথাও কেউ নেই!

কোথাও কেউ নেই বইয়ের ছবি


হৃদয়বিদারক শেষ অংশটুকু না দিয়ে থাকতে পারলাম না।

১৯৮২ সালে ১২ই জুন হত্যাপরাধে বাকেরের প্রাণ দন্ড দেয়া হয়। ১৯৮৩ সনের শেষ দিকে তার মার্সিপিটিশন অগ্রাহ্য হয়ে যায়।

বাকেরের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ১৯৮৫ সনের ১২ ই জানুয়ারি বুধবার ভোর পাঁচটায় সময়। তার ডেডবডি গ্রহণ করার জন্য রোগা,লম্বা, শ্যামলা মত মেয়েটি ভোর রাত থেকে দাঁড়িয়ে ছিল তাকে দায়িত্বরত অবস্থায় থাকা একজন জেলা জানার উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করেন, “আপনি মৃতের হোন, আপনি কি তার লাশ নিবেন?”

মেয়েটি শান্ত গলায় বলল, কেউ না আমি ওর কেউ না। ( বইয়ের শেষ অংশ)


কিছু কথা: 

উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই আবার একটি নাটকও তৈরি করা হয় সে গল্পকে কেন্দ্র করে। সে সময় বিটিভিতে নাটকটি প্রচার করা হয়। বাকি ইতিহাস তো সবারই জানা। নাটকটি নিয়ে মানুষ অসম্ভব পরিমাণ আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিল।

মানুষ রাস্তায় নেমে পরেছিল। হুমায়ূন আহমেদ এর বাড়ির সামনে মিছিল করেছে। সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বেগম জিয়া হুমায়ূন আহমেদকে ফোন করেছিলেন এই ঘটনার জেরে। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত চাওয়া ছিল নাটকের এন্ডিং পরিবর্তন করা। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ কোনো কথাই শুনেননি। তিনি নিজের মত করেই কাজ করে গেছেন। বইটিকে একটি শব্দের পরিবর্তন তিনি আনেন-নি।

বই এবং নাটকের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। কয়েকটা চরিত্র এমনকি গল্পেও। স্ক্রিনে চাইলেও সবকিছু এত ডিটেইলসে দেখানো যায় না। যেটা বইতে লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। এজন্যই বইটাকে কিছু ভালো পাঠক একটু সামনে এগিয়ে রাখে। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন লেখক। গল্পটাও বেশ সুন্দরভাবেই এগিয়ে নিয়েছেন শেষ পর্যন্ত। সব মিলিয়ে বলা যায় হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা উপন্যাসের মধ্যে এটি একটি সেরা উপন্যাস।


এক নজরে বই  পরিচিতি-

বইয়ের নাম- কোথাও কেউ নেই

লেখক- হুমায়ূন আহমেদ

পৃষ্ঠা- ২৫৩

প্রকাশনী- কাকলী

মুদ্রিত মূল্য- ৩০০টাকা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ