দেবদাস উপন্যাসের রিভিউ

দেবদাস হচ্ছেন উপন্যাসের মূল চরিত্র, আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো পার্বতী ডাকনাম পারু। দেবদাস জমিদার ঘরের ছেলে আর পারু একটু নিচু ঘরের মেয়ে। দেবদাস ও পারুর শৈশব পার হচ্ছিল একসাথে খেলাধুলা, পাঠশালায় যাওয়া, কড়া রোদে গিয়ে মাছ ধরা ইত্যাদির। মাস্টার মশাইকে জব্দ করার কারণে দেবদাসের পাঠশালা যাওয়া থেকে মুক্তি মিলে কিন্তু পরে তাকে পাঠানো হয় কলকাতায় পড়াশোনা করার জন্য। এদিকে পারুও মাস্টার মশাইয়ের নামে মিথ্যে অভিযোগ দিলে তাকেও পাঠশালায় যেতে হয় না আর। কিন্তু দেবদাস কলকাতায় চলে গেলে পারুর একাকী সময় কাটে না পরে সে নিজ ইচ্ছায় পাঠশালায় যেতে শুরু করে।

কলকাতায় কিছুদিন থাকার পরে শহরের সব কিছু মানিয়ে চলতে থাকা শিখে যায় দেবদাস, অন্যদিকে গ্রামে পারু দেবদাসকে নিয়েই স্বপ্ন বুনে যায় ঠিক আগের মতো করেই। গরমের ছুটিতে দেবদাস বাড়ি আসলে পারুকে দেখে দেবদাস অবাক হয়ে বলে,“এই কি সেই পারু যার সাথে কত খুনশুটি করেছি, কত বড় হয়ে গেছে সে! এখন দেবদাস পারুর সাথে যেকোনো কথা বলতে গেলে তা আর শৈশবের মত সহজ হয়ে উঠে নদ দেবদাসের কাছেই।

ছেলেমেয়ে বড় হলে অভিভাবকদের মধ্যে বিয়ের চিন্তা এসে যায়, তাই পারুর দাদী দেবদাসের মাকে জানায় দেবদাস পারু একসাথে বড় হয়েছে দুজনের কত মিল তাদের বিয়ে দেয়া যায় কিনা। কিন্তু দেবদাসের মা জানায় এ কিছুতেই হতে পারে না, বাড়ির পাশে আত্মীয়তা করে লোক হাসানোর মত কোন কাজ তারা নাকি করতে পারবে না। আর তাছাড়া পারুরা একটু নিচু জাতের বেচা-কেনা ঘরের কিনা সেজন্য তারা বিয়েতে রাজি হয়নি। এসব কথা পারুর বাবার কানে গেলে তিনি ভীষণ রেগে যান তার মায়ের উপর কেন তিনি নিজে যেচে বিয়ের সমন্ধ নিয়ে গিয়ে ছোট হতে হলেন, তিনি কিছুটা রাগ এবং লজ্জা নিয়ে বললেন “মা, পারু কি কম সুন্দর, আমাদের মেয়েকে আমরা এর থেকে ভালো ঘরে পারুর বিয়ে দিব।”

এদিকে দেবদাসের মা তার বাবাকে জানায় যে পারুর দাদী দেবদাসের সহিত পারুর বিয়ে সমন্ধ... দেবদাসের বাবা এতটুকুই শুনে থামতে বলেন তার মাকে বাড়ির পাশে আত্মীয়তা করে লোক হাসাবো কোন দুঃখে। দেবদাসের মা স্বামীর কথা শুনে আরও দুশ্চিন্তা মুক্ত হন কেননা তারই তো এ সমন্ধে মন বসছে না। দেবদাসকেও সব আদ্যোপান্ত জানান, দেবদাস জিজ্ঞেস করে বাবার কি মত, মা জানায় বাবার কোন মত নেই লোক হাসানোর মত কাজ তিনি করতে পারবেন না কোনোমতে।

দেবদাস বইয়ের ছবি


পারু একদিন মধ্য রাতে দেবদাসের ঘরে এসে জানায় তার ভালোবাসার কথা। তবে দেবদাস পারুকে কোনো সঠিক উওর দিতে না পেরে জানায় যে বাবা-মায়ের অমত এ কিছুতেই হতে পারে না। পারুর সব স্বপ্ন ভেঙে যায় তখনই, যাকে সে এতদিন ধরে আপন-আর ভেবে স্বপ্ন বুনছে সে-ই সব আশা ভেঙে দিলো মুহূর্তেই, পারু নীরবে চলে যায় নিজের বাড়িতে। দেবদাস কলকাতায় চলে যায় কিন্তু তার পড়শোনা বা কলকাতার কোন কিছুতেই তার ভালো লাগছে না, যে মানুষ টা তাকে ভালবাসে তাকে কষ্ট দিয়ে ভাল থাকতে পারে না, কোনো উপায় না পেয়ে সে আবার বাড়ি চলে আসে।

এরই মধ্যে পারুর বিয়ে ঠিক হয় জমিদার ঘরে, বরের বয়স চল্লিশের কিছু বেশি আগের বউ মারা গেছেন। বাড়ি এসে দেবদাস পারুর দেখা আর পায় নাই একদিন পুকুর ঘাটে পারুর সহিত দেখা হয় দেবদাসের, সে জানায় তাকে ছাড়া সেও থাকতে পারছে না, বলেছিল “পারু তুমি যদি রাজি থাকো মা-বাবা যেভাবেই হোক রাজি করাবো আমি।”

কিন্তু পারু জানায় তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আর তাছাড়া সে আর এখন তাকে চায় না পথ ছেড়ে দিলে সে বাড়ি যায়, দেবদাস পারুর এমন ছলনায় অবাক হয়ে যায় এই কি সেই পারু যে মধ্য রাতে তাহার সহিত দেখা করতে এসেছিল। রাগে দেবদাস পারুর কপালে আঘাত করে রক্ত বের হলে নিজের জামা ছিড়ে পারুর কপালে বেধে দেয়। চাঁদের যেমন সৌন্দর্য আছে এবং আছে তার কলঙ্ক, তেমনি তোমার কপালে দিলাম কলঙ্ক। পারু বলে এ আমার কলঙ্ক নয় দেবদা এ আমার গৌরব, কারণ পারু দেবদাসকেই যে ভালবেসে মনে প্রাণে। কিন্তু দেবদাস তাহা যানে না।

তারপর পারুর বিয়ে হয়ে যায়, জমিদার গৃহিণী হয় সে। আর দেবদাস মদে আসক্ত হয় এবং চন্দ্রমুখীর সহিত পরিচয় ঘটে চুনিলালের মাধ্যমে। চন্দ্রমুখী হলেন একজন পতিতা, তাহার সহিত কত মানুষের ঘনিষ্ঠতা কিন্তু দেবদাসকে সে ভালবেসে ফেলে যদিও সে নিজের অবস্থা সম্পর্কে জানেই যে সে কাউকে ভালবাসতে পারে না, কেননা সে একজন পতিতা। দেবদাসও তা বুঝতে পারে যে তার প্রতি চন্দ্রমুখীর দূর্বলতা।

দেবদাসের পিতার মৃত্যু পর জমিদারি ভাগ হয়ে যায়, জমিদারির ভাগ পাওয়ায় বড় অঙ্কের টাকা পেয়ে দেবদাস আরও বেশি মদে আসক্ত হয়, এর ফলে সে লিভার প্লীহায় আক্রান্ত হয় এবং সে বুঝতে পারে যে তাহার সময় শেষ। কিন্তু পারুকে সে কথা দিয়েছিল সে মৃত্যুর পূর্বে আর একবার দেখা দিবে প্রতিজ্ঞা করেছিল, তাই পারুর ঠিকানায় গরু গাড়ি করে রওনা দেয়, গাড়ির পারুর বাড়ির কাছে আসে কিন্তু ততক্ষনে নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে দেবদাস। গাড়োয়ান তাকে গাছতলায় রেখে যান এবং সেখানেই মৃত্যু ঘটে দেবদাসের। পরদিন সকালে পুলিশ এসে চিহ্নিত করেন এটি দেবদাস মূখুযে্যর লাশ।

খবর শুনে তাকে দেখতে ছুটে এসেছিল পারু কিন্তু ততক্ষনে দেবদাসের লাশের শেষ ক্রিয়াও সম্পন্ন হয়ে যায়।

বই: দেবদাস

লেখক: শরৎচন্দ্র

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ