অপেক্ষা বুক রিভিউ। হুমায়ূন আহমেদ।

আপনি কি বেঁচে থাকতে চান? তবে আপনার জীবনে বেঁচে থাকার জন্য অপেক্ষা নামের বিষয়টা খুব বেশি দরকার। অপেক্ষা হচ্ছে বেঁচে থাকার মূল মন্ত্র।

 বই: অপেক্ষা 

লেখক: হুমায়ুন আহমেদ 

পত্রিকায় কতশত নিখোঁজ সংবাদ পড়ি আমরা। মাঝেমধ্যে রাস্তার মাইকিং বা দেয়ালে লাগানো পোস্টার দেখি। এসব দেখে আমরা বড়জোর একটু আফসোস করি অনেকে তেমন একটা খেয়াল করি না, কিন্তু যে পরিবারের কেউ এমন ভাবে হারিয়ে যাই সে পরিবারের মানুষের সামাজিক,আর্থিক,মানসিক অবস্থা কি হয় সেটা আমরা কল্পনায়ও আনতে পারি না। ঠিক এমনই একটি বিষয় নিয়ে অপেক্ষা উপন্যাসটি লেখা। 

কাহিনী সংক্ষেপঃ স্বামী,সন্তান,দেবর, শ্বাশুড়ি নিয়ে ভালোই চলে যাচ্ছে সুরাইয়ার সংসার জীবন। দুপুরে তার কলে কথা হয়েছিলো স্বামী হাসানুজ্জামানের সাথে। সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা আছে তার স্বামীর জন্য, তিনি বাসায় আসলে খুশির খবর দিবে সংসারে নতুন একজন আসতে চলেছে। কিন্তু সেদিন হাসানুজ্জামান অফিস শেষ করে বাসায় আর ফিরেনি। সারারাত খুঁজাখুঁজির পরেও তার কোন খুঁজ-খবর পাওয়া যায়নি।

সুরাইয়া তখনো অপেক্ষায় তার স্বামীর হাসানুজ্জামানের জন্য। সেখান থেকেই শুরু হয় তার অপেক্ষা পালা। তবে দিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে কিন্তু স্বামী বাড়ি ফিরছে না। তখন আর কোনো রাস্তা না পেলে সুরাইয়া সন্তানদের নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়ি। নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন সংসার থেকে, সারাক্ষণ কল্পনা করতে থাকেন স্বামী বাড়ি ফেরার। অপেক্ষা করতে থাকেন কখন আসবেন, কোন কাজে মন বসে না তার, রাতে ঠিকঠাক মতো ঘুমায় না। কাল্পনিক চিন্তা ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকেন সারক্ষন।

অপেক্ষা বইয়ের ছবি


এভাবে চলতে থাকার পর শান্ত স্বভাবের সুরাইয়া হয়ে যায় প্রচুর বদমেজাজী। শুরু হয় ৫ বছরের ছেলে ইমন আর নবজাতক সুপ্রভার প্রতি অবহেলা আর অনাদর। অযত্নে বেড়ে উঠতে থাকে তারা দু’ভাইবোন।

বইয়ের প্রথম দিকে এসবের বাহিরে মন কাড়ে ইমনের চাচা ফিরোজ এবং ইমনের প্রতি দুষ্ট-মিষ্ট ভালোবাসা দেখে। বইয়ের মাঝের দিকে আবার সুপ্রভার প্রতি আর তার মামা জামিলুর রহমানের মমতা মন ছুঁয়ে যায়। প্রথম-মাঝে-শেষ প্রতিটি জায়গায় নতুনত্ব ছিল, কোনো পাঠকের নজর সরানোর সুযোগ নেই।

সুপ্রভার মৃত্যু চোখ ভিজিয়ে দিবে যেকোনো পাঠকের। সুপ্রভার মৃত্যুটা কোন ভাবেই মেনে নেয়ার মতো ছিলো না।মায়ের থেকে এমন কড়াকড়ি শাসন ঐদিন সে কোনোমতে মেনে নিতে পারেনি।

সুরাইয়া চলতে-ফিরতে, তবে সে কল্পনায়, বাস্তবে কষ্ট বা সুখে সবকিছুতে দেখতে পান তার স্বামী বাড়ি ফিরেছেন,তার কথা বলছেন, সব আগের মতো ঠিক হয়ে গিয়েছে। কথাগুলো মনে হচ্ছিলো অপেক্ষা জিনিস সত্যি মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক।

স্বাভাবিক এবং ঘরোয়া সুরাইয়ার এমন বদলে যাওয়া,শুভ্রভার শেষ পরিণতি,ইমনের বেড়ে ওঠা এতোকিছুর মধ্যেও সুরাইয়ার অপেক্ষার শেষ হয়না, সে তার মতো করেি অপেক্ষায়। এমন করেই এগুতে থাকে উপন্যাসটি। সুরাইয়ার কাল্পনিক ধারণা বলছিল, ইমনের বিয়ের রাতে ফিরবেন স্বামী হাসানুজ্জামান। অবশেষে ইমনের বিয়েও হয়ে গেল। বিয়ের রাতে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছে ইমনের বাবার জন্য। 

হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ।

আদো কি ফিরেছিলেন হাসানুজ্জামান..... 

পছন্দের কিছু লাইন-

★“মানুষের জীবন কি চক্রের মত? চক্রের কোন শুরু আছে শেষ নেই, মানবজীবনও কি তাই?

★“পৃথিবীতে সকল আনন্দের জিনিস গুলো পাওয়া যায় বিনামুল্যে। যেমন: জোছনা, বর্ষার দিনের বৃষ্টি..”

★“জীবিতদের জন্য মানুষ অপেক্ষা করে, মৃতদের জন্য কেউ অপেক্ষা করেনা।”


উপন্যাস সম্পর্কে ব্যাক্তিগত মতামতঃ-


একটি উপন্যাসের সার্থকতার সিংহভাগ নির্ভর করে সেই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর উপরে, চরিত্রগুলোর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমেই উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে। তাই চরিত্রগুলো সুগঠিত হলে উপন্যাসের কাহিনীর এগিয়ে যাওয়ার পথটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। অপেক্ষা উপন্যাসও এর ব্যতিক্রম নয়, এই উপন্যাসেও বেশ কয়েকটি শক্তিশালী চরিত্র আছে যারা গল্পকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে। 


সব মিলিয়ে বলা যায় হুমায়ূন আহমেদের সেরা উপন্যাসগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হলে অপেক্ষার নামটা অবশ্যই সেখানে থাকবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন জরিপেও খেয়াল করা যায় যে অনেক পাঠকেরই সবচেয়ে প্রিয় বই অপেক্ষা। হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত যারা আছেন তাদের এই বইটা এতদিনে পড়ে ফেলার কথা, যদি কোনো কারণে পড়া না হয়ে থাকে তবে অবশ্যই পড়ে ফেলবেন। বইটি পড়লে উপরে উল্লেখ করা প্রশ্নগুলোর উত্তর তো পাবেনই সাথে মানব জীবনের কিছু কঠিন সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধিও করতে পারবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ